ওয়াদুদ ভূঁইয়া
চেয়ারম্যান, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড (সিএইচটিডিবি)
সিএইচটিডিবি চেয়ারম্যান ওয়াদুদ ভূইয়া
ওয়াদুদ ভুইয়া একজন মানুষ কিন্তু বহুমাত্রিকতা তাকে অনুপম মাধুর্যে বিকশিত করেছে। তিনি জীবনকে মনে করেন প্রকৃতির দাস। প্রকৃতিকে মনে করেন জীবনের উৎস। তাই পৃথিবীর সবকিছু তার কাছে নিজের মতই গুরুত্বপূর্ণ ও প্রিয়। কোন কিছু তার অবহেলায় আসে না। প্রকৃতিকে অবহেলা করা মানে নিজেকে অবহেলা করা। তিনি প্রকৃতির মাঝে বেড়ে উঠেছে। মা-বাবা জন্ম দিয়েছেন, নিঃশ্বা দিয়েছে প্রকৃত, বিশ্বাস দিয়েছে প্রকৃতি। তাই প্রকৃতিকে তিনি নিরন্তর ভালবাসেন, যা তাকে তার এলাকার সেবা করার মানসিকতায় উদ্বেল করে তুলে।
খাগড়াছড়ির আজকের আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রাণ পেয়েছে ওয়াদুদ ভুইয়ার হাতে। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিক ব্যবস্থায় ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেন। তিনি জানান সি ফর ডি। অর্থাৎ Communication for Development. তাই চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পরপরই পার্বত্য চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে নিজেকে সঁপে দেন।
পার্বত্য অঞ্চল প্রাকৃতিক সম্পদের ভাণ্ডার হলেও আধুনিক ব্যবস্থার অভাবে এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা করুন। এটি তাকে মর্মাহত করে। তিনি স্ব উদ্যোগে পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত সবার আর্থসামাজিক অবস্থা উন্নয়নের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ছোট ছোট অসংখ্য প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে গ্রামের ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষের আয়ের ব্যবস্থা করেন। গ্রহণ করেন বিভিন্ন আয়বর্ধণমূলক প্রকল্প।
১৯৫৫ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন প্রাপ্ত হন এবং প্যারাট্রুপার ও কমান্ডো হিসেবে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। তিনি গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেন এবং ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে খেমকারান সেক্টরে বীরত্ব প্রদর্শন করে “হিলাল-ই-জুরাত” উপাধি অর্জন করেন। ১৯৭০ সালে তিনি মেজর পদে চট্টগ্রামের নবগঠিত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পশ্চিম পাকিস্তানী বাহিনী পূর্ব বাংলায় গণহত্যা চালানোর পর জিয়া বিদ্রোহ করেন এবং ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১, ১১ নম্বর সেক্টর এবং জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক নেতৃত্ব দেন। তাঁর সাহসিকতা ও নেতৃত্বের জন্য তিনি “বীর উত্তম” উপাধিতে ভূষিত হন।
স্বাধীনতার পর জিয়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন; পুলিশ বাহিনী এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য সংখ্যা দ্বিগুণ করে পেশাগত মান উন্নয়ন করেন। একইসাথে তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখেন, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম পুনরায় চালু করেন, সংবাদপত্রের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন এবং তথ্যপ্রবাহের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন।
১৯৭৮ সালে তিনি জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল গঠন করেন এবং পরে বিএনপি—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠা করেন। এই দলের মাধ্যমে তিনি তরুণদের রাজনীতিতে যুক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি করেন এবং ১৯৭৯ সালে সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে ধর্মকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করা উচিত নয় বলে তিনি দলের কর্মীদের সুনির্দিষ্টভাবে দিকনির্দেশনা দেন।
রাষ্ট্রপতি জিয়া পররাষ্ট্রনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব থেকে বেরিয়ে চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। তাঁর কূটনীতিক নীতির ফলেই বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল প্রবাসী শ্রমিক পাঠাতে সক্ষম হয় এবং দেশ অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হয়। একইসাথে তিনি দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে অবস্থানকালে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি শহীদ হন। তাঁর জানাজায় বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ জনসমাগম ঘটে, যেখানে প্রায় ২০ লাখ মানুষ অংশগ্রহণ করে। তাঁকে ঢাকার শেরে বাংলা নগরে সমাহিত করা হয়, এবং আজও তিনি একজন বীর স্বাধীনতা সেনানী, রাষ্ট্রনায়ক ও গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে বাঙালির হৃদয়ে চিরস্থায়ী স্থান করে নিয়েছেন।

