ওয়াদুদ ভূইয়া: আদর্শ জননেতার প্রতিভূ

লেখক: ড. জলিল আহমেদ: রাজনীতিবিদ, নেতা, বন্ধু, সংগঠক, সাধারণ মানুষ, প্রশাসক, কলামিস্ট, বাগ্মী, শিক্ষাবিদ, সংসদ সদস্য, ছাত্র, দেশপ্রেমিক, অসাম্প্রদায়িক মনোভাব, উদারতা যে দিক হতে বিবেচনা করা হোক না কেন, নিবিড়ি পর্যালোচনায় ওয়াদুদ ভূইয়া যে কোন বিবেচনায় অনবদ্য, নিরূপম এবং অসাধারণ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত নিদাঘ চরিত্রের অধিকারী একজন প্রমুগ্ধ জননেতা। একজন মানুষকে যে সকল গুনাবলী উন্নত রাজনীতিবিদ, বিখ্যাত নেতা এবং আদর্শ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে তার সব গুণাবলী ওয়াদুদ ভূইয়ার রয়েছে। ক্ষমতার বিজ্ঞোচিত ব্যবহারে তার মত সুদক্ষ নেতার বড় অভাবে দেশে। অহংবোধ, প্রতিশোধপরায়নহীন মনোভাব, বলিষ্ঠ চরিত্রের পাহাড়সম দৃঢ়তা তাকে গড়ে তুলেছে একজন আকর্ষণীয় মানুষ হিসেবে। যেই তার সান্নিধ্যে গিয়েছেন সেই মুগ্ধ হয়েছেন কোন না কোনভাবে। যা তাকে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তার শীর্ষে তুলে নিয়ে যাচ্ছে।
ওয়াদুদ ভূইয়াকে চেনেন না, এমন মানুষ বাংলাদেশে খুব কম। পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনি অবিসংবাদিত নেতা এবং নির্মল চরিত্রের একজন অনবদ্য মানুষ হিসেবে পরিচিত। তিনি একজন খাঁটি মানুষ, খাঁটি বন্ধু, যার চিন্তা চেতনা পাহাড়ি সবুজের অন্তহীন প্রশান্তির মত প্রশস্ত এবং প্রকৃতির মত আকর্ষণীয়। বাল্যকালে বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা হতে শুরু করে রাজনীতি এবং প্রাত্যাহিক জীবনের প্রত্যেকটি স্তরে ওয়াদুদ ভূইয়া মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত একজন উদার মনের পরিচ্ছন্ন মানুষ। গ্রহণের বিশাল ক্ষমতা তাঁকে আলোর মতো নিবিড় আর আকাশের মতো অপরিমেয় করে তুলেছে। সময় তার জীবনের অবয়ব, কর্ম অলঙ্কার। তার কাছে জীবন প্রকৃতির দান কিন্তু উন্নত জীবন-যাপন কর্মের উপহার। তাই তিনি জীবনকে শুধু সময় দিয়ে নয়, কর্ম ও অধ্যবসায়ের সমন্বিত প্রতিবিম্বে বিভূষিত করার প্রত্যয়ে দৃপ্ত রাখাকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছার অন্যতমম উপায় মনে করেন। সবাইকে এমনই উপদেশ দেন তিনি। ওয়াদুদ ভূইয়া একজন ভালো বন্ধু। আদর্শ মানুষ না হলে কারও পক্ষে ভালো বন্ধু হওয়া সম্ভব নয়। কাজ, আনন্দ, বিশ্রাম ও সাংস্কৃতিক অনুপ্রসÑ সবখানে তিনি সাবলীল, সবসময় নান্দনিক। অহঙ্কার করার সকল উপাদান থাকা সত্ত্বেও তিনি সাধারণে মিশে যাবার প্রাবল্যে উদ্বেল। এত উদার, নিরহঙ্কার, অমায়িক ও সজ্জন ব্যক্তি বর্তমানে বিরল। অনেকের মাঝে তাঁকে অনুকরণ করার ইচ্ছা দেখেছি কিন্তু কিন্তু সম্পূর্ণভাবে তাঁকে অনুকরণ করা কারও পক্ষে সম্ভব হয় না। তিনি অনন্য ও ব্যতিক্রমী ব্যক্তি। অনুসারী, ভক্ত এবং সহকর্মীদের কাছে তাঁর জীবন ও কর্ম প্রেরণার আলেক্ষ্য। তিনি মনে করেন, খরভব রং াবৎু াবৎু ংযড়ৎঃ, নঁঃ ঃযবৎব রং ধষধিুং ঃরসব বহড়ঁময ভড়ৎ পড়ঁৎঃবংু. তাই তিনি সবার সাথে ভালো আচরণ করার চেষ্টা করেন। যা একজন রাজনীতিবিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

ছাত্র জীবন হতে তিনি মেধাবী, বুদ্ধিমান ও অমায়িক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ব্যবহারে যেমন ছিলেন বিনয়ী তেমনি ধীর। আলোচনায় শান্ত কিন্তু যৌক্তিক। আচরণে শিষ্ট কিন্তু বিচক্ষণতায় তীক্ষè। দুর্বলের বন্ধু, অত্যচারিতের প্রতি কঠোর। তার দৈহিক গড়ন মোগল রক্তধারায় অবগাহিত। চেহারায় সবাক মাধুর্য্য অনিবার্য মুগ্ধতার আদুরে লাস্য যেন। এখনকার মত ছাত্র জীবনেও মুখটা কিছু নিচু অথচ সটান হয়ে রাজপুত্রের মতো চলাফেরা করতেন। এলাকায় ভূইয়া পরিবার যেমন ছিল প্রভাবশালী তেমনি ছিল সৌহার্দ্যময় ও দুঃস্থ বান্ধব। তাঁর কণ্ঠ ছিল মোলায়েম ও মার্জিত। সহজে কারও সাথে রূঢ় ভাষায় কথা বলতেন না। সকল সহপাঠী ও সতীর্থ তাকে বিনয়ী, পরপোকারী এবং বিপদের সহায়ক পরবম বন্ধু মনে করতেন। সিনিয়র-জুনিয়র সবার প্রতি যথাযোগ্য আচরণ এবং বিনয়ের সাথে রাজকীয় জৌলুসের মিশ্রণ ছাত্র হিসেবে ওয়াদুদ ভূইয়াকে বিরল মাধুর্য্যে ম-িত করে তুলেছিল। সে ছোটবেলা থেকে শুরু তার নেতৃত্বের গুণাবলীর বিকাশ।

তার কয়েকজন শিক্ষকের ভাষায়, ছাত্র হিসেবে ওয়াদুদ ভূইয়া ছিলেন মেধাবী, ধীর, ভদ্র, সজ্জন এবং সহানুভূতিশীল। বিদ্যালয়ের, শ্রেণির অনেক অসহায় ছাত্রকে তিনি সাহায্য করেছেন, তার পরিবারের মাধ্যমে সাহায্য করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। অনেক শিক্ষকের আর্থিক সংকটেও ওয়াদুদ ভূইয়া উদার মনে এগিয়ে এসেছেন। তিনি নিজের ক্ষতি করতে পারেন, তবে অন্য কারও নয়। সৃষ্টির সব কিছুর প্রতি তিনি মমত্বশীল। আমাদের চারিপাশে যা আছে সব কিছুতে তার দৃষ্টি আলোর মতো অবিরাম, বৃষ্টির মতো স্নাত, বিকেলের রোদের মতো ঈষদুষ্ণ।’ তার ছাত্র-জীবনের বন্ধু ইকবালের ভাষায় বলা যায়, ওয়াদুদ ভূইয়া সবসময় উচ্ছল, সবসময় আন্তরিক, কথা ও কাজে বিন্দুমাত্র ফাঁক থাকে না। বন্ধু হিসেবে ওয়াদুদ ভূইয়ার স্মৃতিচারণ প্রসঙ্গে আলম বলেন, গু রফবধ ড়ভ মড়ড়ফ পড়সঢ়ধহু রং ঃযব পড়সঢ়ধহু ড়ভ পষবাবৎ, বিষষ-রহভড়ৎসবফ ঢ়বড়ঢ়ষব, যিড় যধাব ধ মৎবধঃ ফবধষ ড়ভ পড়হাবৎংধঃরড়হ; ঃযধঃ রং যিধঃ ও পধষষ মড়ড়ফ পড়সঢ়ধহু.

কৃতজ্ঞতাকে মানবতার সর্বোৎকৃষ্ট প্রকাশ বলা হয়। ওয়াদু ভূইয়া কৃতজ্ঞতামনস্কতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কেউ তাঁর সামান্য উপকার করলে তিনি বহুভাবে বহুগুনে তার প্রকাশ ঘটান। তিনি মনে করেন, এৎধঃরঃঁফব রং ঃযব ভধরৎবংঃ নষড়ংংড়স যিরপয ংঢ়ৎরহমং ভৎড়স ঃযব ংড়ঁষ. তিনি বাঙ্গালি, উপজাতি, অ-উপজাতি নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের প্রতি, প্রকৃতির মত গভীর অনুপমতায় কৃতজ্ঞ। হয়ত তাই কারও ক্ষতি করতে পারেন না। জীবনে তার প্রধান লক্ষ্য পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত সকল মানুষ, প্রকৃতি এবং পরিবেশের পূর্ণ শান্তি, নিরাপত্তা। তিনি তার প্রিয় পার্বত্য এলাকাকে এমন একটি শান্তি ও সমৃদ্ধময় জনপদ হিসেবে দেখতে চান যেখানে জাতিধর্ম, বর্ণ, উপজাতি-অউপজাতি নির্বিশেষে সবাই শান্তিপূর্ণ সহবস্থানে বসবাস করবেন।

মূলত ওয়াদুদ ভূইয়া রাজনীতিবিদ হয়েও নিরপেক্ষতার ভূষণ। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন আদর্শ বিচারক ও নিরপেক্ষ প্রশাসকের ন্যায় সমতারভিত্তিতে বিধিগত ন্যায্যতায় সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। রাজনীতি বা দলের প্রতি অনুগত থেকে কীভাবে দেশের উন্নয়ন করা যায় সেটিই রাজনীতিক আদর্শের গন্তব্য। এরূপ নিরপেক্ষতা কেবল বিচারের নিক্তিতে পরিমাপ্য। রাজনীতিক পরিম-লে রাজনীতিক পদ বিন্যাসে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে নিরপেক্ষ থাকা খুবই কঠিন। কিন্তু ওয়াদুদ ভূইয়া এ কঠিন কাজটিই করছেন। এ জন্য তাকে প্রচুর ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। এক কথায় বলা যায়, রাজনীতিক দলের সক্রিয় নেতা হয়েও ওয়াদুদ ভূইয়ার নিরপেক্ষতা সর্বাঙ্গীন সুন্দর। তাঁর ভাষা, কথা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব অসাধারণ। যে কোনো মুহূর্তে যে কোন বিষয়ের উপর যে কোনো প্রশ্নের এমন উত্তর দেন যা প্রশ্নকারী, শ্রোতা এবং পক্ষ-বিপক্ষ সবাইকে সন্তুষ্ট করার উপাদানে ভরপুর থাকে। কারও প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ পায় না।’ ছাত্রজীবনেও তিনি ছিলেন ন্যয়বান ও নিরপেক্ষ। রামগড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে কোনো ঝগড়া হলে সবাই ওয়াদুদ ভূইয়াকে বিচারক হিসেবে মেনে নিত। এবং তিনি নিরপেক্ষভাবে ন্যায়ভিত্তিক সমাধান দিতেন। এ গুণটা তাঁর মাঝে এখন আরও বেশি পরিস্ফুট, আরও বেশি দৃশ্যমান।

পার্বত্য এলাকা বাংলাদেশের একটি বিশেষ এলকা। এ এলাকার প্রশাসন ও আর্থসামাজিক অবস্থা সমতল হতে ভিন্ন। এলাকাটি বাঙ্গালি-অবাঙ্গালিসহ বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় পদচারণায় মুগ্ধ। তিনি মনে করেন, শান্তি আর নিরাপত্তার কোন বিকল্প নেই। মানুষ যতই সম্পদশালী হোক না কেন, শারীরিক সুস্থতা না থাকলে তা পুরো মূল্যহীন। তেমনি একটা জাতি বা জনগোষ্ঠী কিংবা এলাকার জনগণ স্বার্থ কিংবা অর্থের জন্য যদি নিজেদের মধ্যে সম্প্রীতি নষ্ট করার প্রয়াসে লিপ্ত হয় তখন সকল নিরাপত্তা আর শান্তি ব্যাহত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় কোন কেউ শান্তিতে বসবাস করতে পারে না। কলহ-কোন্দল তাই সবসময় পরিত্যাজ্য। তাই পার্বত্যবাসীর প্রতি তার উদাত্ত আহবান সর্বক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ধৈর্য্যে শান্তি বজায় রাখা। তিনি মনে করেন, পাহাড়ে বসবাসরত জনগোষ্ঠ পরস্পর সম্প্রীতি, শান্তিময় সহবস্থান, সমঝোতা ও পরমত নির্ভরশীলতার সাথে বাস করতে পারলে পার্বত্য এলাকা পৃথিবীর একটি শ্রেষ্ঠ সমৃদ্ধশীল এলকায় পরিণত হবে।

ওয়াদুদ ভূইয়া, ভূইয়া পরিবারের গর্ব, পার্বত্য এলাকার অবিসংবাদিত নেতা। রামগড়ে তিনি অজাতশত্রু। খাগড়াছড়িতে জননেতা, পার্বত্য এলাকার আধুনিকতার জনক। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন দূরদর্শী ও বিচক্ষণ প্রশাসক এবং সমগ্র বাংলাদেশে মার্জিত মননশীলতার অধিকারী একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে পরিচিত। তিনি শহিদ জিয়ার আদর্শের একজন একনিষ্ঠ কর্মী বাংলাদেশ ছাত্রদল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রাণদাতা। তার হাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল জন্ম নিয়েছে নব দিগন্তের উল্লাস বিলাসে। তার পূর্বেও চট্ট্গ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতয়তাবাদী ছাত্রদল ছিল। সেটি ছিল কঙ্কালের মত একটি নিষ্ক্রিয় অবকঠামো, ঠিক কঙ্কালের মত ধীওে রূপ নিচ্ছিল। খাগড়াছড়িতে বিএনপি এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের অবস্থা ছিল আরও করুণ। খাগড়াছড়িতে শহিদ জিয়ার রাজনীতিক দর্শনের প্রচার ও প্রসারে কিশোর ওয়াদুদ ছিলেন অনিবার্য অনুঘোটক। রামগড় খাগড়াছড়িতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রচার প্রসারে ওয়াদুদ ভূইয়ার কথা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহিদ জিয়াও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, স্বীকৃতি পেয়েছেন ওয়াদুদ ভূইয়া। সে বয়সে একজন রাষ্ট্রপতির নিকট হতে অমন স্বীকৃতি অর্জণ ছিল অনবদ্য বিষয়। শহিদ জিয়া বলেছিলেন: ওয়াদুদ, তুমি অসাধ্য সাধন করেছো। শহিদ জিয়ার মতে, ‘দলের প্রতি নিবেদিত এমন তরুণ ছাত্র নেতা খুব কম আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগে রামগড় কলেজের ছাত্র থাকাকালীন ওয়াদুদ ভূইয়া যে রাজনীতিক ক্ষমতা ও প্রভাবের অধিকারী ছিলেন তা ছিল অবিশ্বাস্য। অন্য কেউ হলে হয়ত নিজেকে সংবরণ করতে পারতেন না। কিন্তু তিনি সকল লোভের ঊর্ধ্বে উঠে দলের প্রতি নিবেদিত ছিলেন নির্ভর ব্যক্ততায়। আত্মবিশ্বাস ছিল তার প্রবল, সাধণা ছিল অনল।

পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ির উপজেলা রামগড়ে তার জন্ম। চারিদিকে উপজাতীয় জনগোষ্ঠী, কোনদিন তাদের কারও সাথে বিরোধ হয়নি। শিশু বয়সে শিখে নিয়েছিলেন চাকমা ভাষা। এটি ছিল তার সার্বজননীতার নির্বাণ। এমন কয়জনে পারে!! এখনও তার মননশীলতায় সে বোধ জাগ্রত-পাহাড়ি বাঙ্গালি ঠিক ব্যক্তির মত পৃথক কিন্তু বার একটিই , তা হলো মানুষ, মানুষ, মানুষ। পর্বত্য চট্টগ্রামের বাঙ্গালিদের কাছে যেমন তিনি প্রিয় তেমনি প্রিয় উপজাতীয়দের কাছে। তত্ত্বাবধায়ক নামীয় সামরিক সরকারের আমলে তাকে অন্যান্য নেতাগণের ন্যায় মিথ্যা অজুহাতে গ্রেফতার করা হলে তার মুক্তির দাবিতে বাঙ্গালি চেয়ে অধিকমাত্রায় জেগে উঠেছিলেন উপজাতীয় গোষ্ঠী। তিনি এখনও তাদের সে অবদানের কথা শ্রদ্ধা আর প্রশংসাভরে স্মরণ করেন। উপজাতীরা তাকে মনে করেন বন্ধু, নিরাপদ আশ্রয়। তিনি বিএনপি করেন। এটি কারও নিজস্ব দল নয়, আমজনতার দল। শহিদ জিয়া এভাবে চিন্তা করতেন। তাই তিনিই প্রথম বাংলাদেশে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শহিদ জিয়ার নিবিড় অনুসারী হিসেবে ওয়াদুদ ভূইয়ার কাছে দল নয়, দেশই বড়। মানুষ নয়, কর্মই বিবেচ্য। এটিই তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, যা সবাইকে মুগ্ধ করে।

সহানুভূতি মানব জীবনের একটি অনবদ্য গুণ। খুব কম প্রাণির মধ্যে এটি দেখা যায়। একজন মানুষের মনুষ্যত্ব যে বিষয়টা দিয়ে সবচেয়ে বেশি পরিস্ফুট হয় সেটি সহানুভূতি। ওয়াদুদ ভূইয়া ব্যক্তি হয়েও যেন সহানুভূতির এক অনুপম দৃষ্টান্ত। এ প্রসঙ্গে তার ছাত্রকালীন ইতোপূর্বে বর্ণিত ঘটনা ছাড়াও আরও বহু উদাহরণ টানা যায়। তার সহায়তায়, তার পিতামাতার বদান্যতায় কত গরিব ছাত্রছাত্রী যে অধ্যয়ন করে জীবনে প্রতিষ্ঠা হয়েছেন তা এখনও রামগড়বাসীর মুখে মুখে প্রচলিত।

সময়বোধ ও কর্তব্যপরায়নতার উজ্জ্বল আলেখ্য ওয়াদুদ ভূইয়া। যেখানে থাকুন এবং যে কাজই করুন না কেন, সময়মত পূর্ব নির্ধারিত স্থানে গিয়ে হাজির হন। জননেতা হিসেবে অধিকাংশ সময় জনসংযোগে ব্যস্ত থাকলেও সরকারি দায়িত্বে তিনি কখনও অবহেলা করেননি। প্রতিদিনের কাজ প্রতিদিন যথাসময়ে শেষ করেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন এক কর্মকর্তার কথা এখানে প্রণিধানযোগ্য- তিনি রাজনীতি করেন, নিজস্ব অফিস করেন, সভা সমিতি করেন, দর্শনার্থীদের সময় দেন; পরিবার-পরিজন আছে, তাদেরকেও পর্যাপ্ত সময় দেন এতকিছুর পরও সবকিছু কীভাবে যথাসময়ে করেন ভেবে বিস্মিত হই।”

অনেক লোক আছে তাদের সবসময় ব্যস্ত দেখা যায়, অথচ কাজের মতো কোনো কাজ থাকে না, অযথা ব্যস্ততা দেখিয়ে নিজেকে মূল্যবান ভাবানোর চেষ্টা করে। ওয়াদুদ ভূইয়ার মধ্যে এ জিনিসটি কখনও দেখা যায়নি। তিনি মনে করেন, ব্যস্ততা কাজের জন্য, অকাজের জন্য নয়। যারা কাজের নামে অকাজ করে তারা নেতা নন, নেতা হবার ভান করেন মাত্র। ব্যস্ততা দেখানোর কোন বিষয় নয়, দেখার বিষয়। কাজ করতে করতে ব্যস্ততা নীরবে চলে আসে। এ অবস্থায় সকল কাজ আনন্দময় হয়ে উঠে। ওয়াদুদ ভূইয়ার ভাষায়: ‘কাজ করাকে অনেকে কষ্টকর মনে করেন। আমি জীবনে কখনও কাজকে কষ্ট মনে করিনি, আনন্দ মনে করেছি। সকল কাজ আনন্দ নিয়েই করেছি। কাজই আমার আনন্দ, তা যত ক্ষুদ্রই হোক না। যারা কাজকে কষ্টকর মনে করে তাদের প্রতি মুহূর্ত কাটে মৃত্যু কষ্টে। কাজ জীবনের নিঃশ্বাস, স্থায়ীত্বের প্রশ্বাস। তাই সব কিছু ধীরস্থিরভাবে করা উচিত। এ জন্য তিনি কিছুকে, কোন ব্যক্তি তিনি যত সাধারণই হোকন না কেন সবাইকে গুরুত্ব দেন, শ্রদ্ধা করেন, ভালবাসেন, স্নেহ করে।

কাজের ক্ষেত্রে তার নিজস্ব একটা সূত্র রয়েছে। সেটি তিনি আব্রাহাম লিংকনের কাছ থেকে পেয়েছেন, শানিত করেছেন, শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কর্মে। প্রথমে নির্ধারণ করতে হবে সামর্থ্য, তারপর উদ্দেশ্য। এ দুটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারপর বেছে নিতে হবে পছন্দ। এরপর বিবেচনা, তারপর সিদ্ধান্ত। সবার শেষে কার্য সূচনা। এ সব না ভেবে যদি তাড়াহুড়ো করে কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ শুরু করা হয় তা হয়ত সাময়িক ফলদায়ক হতে পারে কিন্তু দীর্ঘ বিবেচনায় তা কখনও কল্যাণকর হতে পারে না। বাংলাদেশে রাস্তাঘাট, ভবন কিংবা পরিকল্পনা প্রণয়ণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে চিন্তা করা হয় না। তাই প্রতিনিয়ত দেশকে, জনগণকে এবং রাষ্ট্রকে ভুগতে হয়। একজন প্রকৃত 56নেতা, প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক সাধারণ ও স্বাভাবিক অবস্থায় তাড়াহুড়ো করে কাজ করেন না। এটি অনেকটা নিজের চোখ নিজে তুলে ফেলার মত অবিমৃষ্যকরতা। তিনি মনে করেন-Work is not punishment. It is reward, strength pleasure. কর্মে তিনি স্ফটিকের মত স্বচ্ছ ও গণিতের মতো আক্ষরিক, চিন্তায় প্রয়োজনের মতো গতিশীল, ভালোবাসায় পিতার মতো লাস্যময়, স্নেহে জননীর মতো সুবিনয়; বিপদে চাকার মত ধৈর্য্যশীল। এগুলোই নেতার গুণাবলী। এ সব যার নেই তার নেতা হবার যোগ্যতাও নেই। তিনি আগামীকালের অপেক্ষায় থাকেন না, আগামীকাল কখনও আসে না। এমনকি তিনি এতই আত্মবিশ্বাসী যে, সাফল্যের জন্যও অপেক্ষা করেন না। সাফল্যের জন্য অপেক্ষা করার সময় তাঁর নেই। তার কাজ এগিয়ে চলা, শুধু এগিয়ে চলা। এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে সাফল্যই তাঁর পিছু নেয়। তিনি লক্ষ্যে স্থির। কোথাও তাড়াতাড়ি পৌঁছার চেষ্টা করার আগে কেন, কোথায়, কীভাবে এবং কখন যেতে হবে সেটিই আগে স্থির করে নেন। তাই তাঁর লক্ষ্য চ্যুত হয় না, সময় অপচয় হয় না।

ওয়াদু ভূইয় সময়পুষ্ট একজন স্বসৃষ্ট মানুষ। এতদূর এসেছেন নিজের চেষ্টায়, নিজের যোগ্যতায়। কারও করুণায় নয়। তিনি অতীতের জন্য আফশোস করেন না এবং ভবিষ্যতের কথা ভেবে অস্থিরও হন না। যারা অতীত নিয়ে ভাবেন এবং ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কিত থাকেন তাদের বর্তমানটাই জাহান্নামের মত অসহ্যময় হয়ে উঠে। তাই ওয়াদুদ ভূইয়ার অতীত-ভবিষ্যত শুধু পথ চলার প্রেরণা, ভাবার বিষয় নয়। এজন্য যে কোন বিপদে তিনি অবিচল থাকতে পারেন। ওয়াদুদ ভূইয়া মনে করেন, কর্ম, জয়-পরাজয় ও ত্যাগ এ তিনটির কার্যকর সমন্বয় ঘটানো সম্ভব হলে জীবনের যে কোন লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। তিনি এগুলোর সমন্বয়ে সকল পার্বত্যবাসীর কল্যাণে নিবেদিত থেকে জীবনের প্রতিটি বিষয়কে উপভোগ করেন নৈসর্গিক সৌন্দর্যের নির্মল আনন্দে। লক্ষ্য ভেদকে ওয়াদু ভূইয়া গন্তব্যস্থল মনে করেন না। মনে করেন পরবর্তী যাত্রার বিমুগ্ধ হাতছানি। আরও দ্রুত এবং লম্বা পথ পাড়ি দেয়ার তাগিদ। পথ যত লম্বা হোক তিনি সেদিকে নজর দেন না। যার আরম্ভ আছে তার শেষও আছে। যত বড় জিনিসই হোক না কেন, বিন্দু হতে সব কিছুর সূচনা। যেখানে পুরাতনের অন্তিমতা সেখানে নবত্বের সূচনাগার। পুরাতনের জন্য অহেতুক আফশোস করে সময় নষ্ট করা বোকামি। তাই তিনি পার্বত্যবাসীর কল্যাণে নতুনভাবে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে বদ্ধ পরিকর। এ পরিকল্পনায় আছে পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী সকল জনগোষ্ঠীর আত্মমর্যাদা, সুযোগ, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, ভ্রাতৃত্ববোধ, শান্তি এবং সুবিমল পরিবেশ সৃষ্টি করা। যে কোন মূল্যে তিনি এগুলো করার দৃঢ় প্রত্যয়ে রাতদিন কঠোর শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। আমি মনে করি এ বিষয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবার উচিত তাঁকে ঐকান্তিকভাবে সহায়তা করা। যাতে তিনি একটি স্বপ্নময় ভ্রাতৃপ্রতিম ও সম্প্রীতিময় পার্বত্য এলাক গড়ে তুলতে পারেন। যেখানে সব গোষ্ঠীর লোক জীবনকে পরিপূর্ণ শান্তিতে উপভোগ করতে পারবেন। থাকবে না কোন দ্বেষ, ক্লেশ, হানাহানি।

ওয়াদুদ ভূইয়া হাস্যমূখের একজন অমায়িক ব্যক্তি। বলা হয় যিনি হাসতে পারেন তিনি পৃথিবীর আনন্দ, স্রষ্টা তাকে পৃথিবীকে বাগানময় করার জন্যই প্রেরণ করেছেন। ওয়াদুদ ভূইয়াও তেমন এক বিরল প্রতিভার অধিকারী হাস্যমুখর ব্যক্তিত্ব। জীবনকে কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে সততার আলয়ে পরিচালনা করেন বলে তাঁর মুখে হাসির ছটা মেঘহীন রূপোলি বিকেলে মতো অবিকল লেপ্টে থাকে প্রকৃতির পরতে পরতে। তাঁর কাজ মমতায় মমতায় উদ্বেল, শাসনবিন্দু উদারতার সৌকর্ষ্যে মুখর, গ্রহণ ক্ষমতা আলোর মতো মুগ্ধকর। তার কাছে পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী উপজাতি-অউপজাতি সবাই সমান। তিনি সবাইকে নিজের মত মনে করেন। মনে করেন নিজের দেহ, অঙ্গ আর পরিচালিত হন বিবেকতাড়িত বিবেচনা বোধের মাধ্যমে। তার লক্ষ্য পার্বত্যবাসীর সার্বজনীন আবাস, শান্তিমূখর সমাজ, আনন্দঘন ও উৎসবময় জীবন। যেখানে সবাই একই পরিবারের সদস্যের মত একই স্থানে পরম শান্তিতে নিরাপত্তার সাথে বসবাস করতে পারবে। এ রকম একটি পার্বত্য এলাকা গড়ে তোলাই তার জীবনের প্রথম ও শেষ লক্ষ্য। রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, কলামিস্ট, সমাজ-সংস্কারক, শিক্ষানুরাগী, সংগঠক, প্রশাসক ও সংসদ সদস্য এতগুলো বিষয়কে এক সাথে নিয়েও তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে কোনরূপ অহমিকা বোধ ছাড়া সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যান লক্ষ্যে। ব্যাঘাত ঘটে না সংসার জীবনের। সময় দেন সবাইকে যার যেমন প্রাপ্য। উপস্থিত হন যেখানে প্রয়োজন। এত কর্মব্যস্ততার মাঝেও মুখের হাসির মলিনতা নেই। তিনি মনে করেন- এক ভালো থাকার চেয়ে মরণই শ্রেয়। তাই পার্বত্য এলাকাকে সত্যিকার অর্থে শান্তির নীড় হিসেবে গড়ে তুলতে না পারা পর্যন্ত তার বিশ্রাম নেই, শান্তি নেই।

সময়কে যদি কর্মের মাধ্যমে প্রগতিভূত সৃষ্টির প্রতি অনুগত রেখে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য অধ্যবসায়-প্রসূত অদম্যতা বিমূর্ত করা যায়, তাহলে সে ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টির কাছে কোনো কিছু অসম্ভব নয়। কাজের প্রতি নিষ্ঠা, সময়ের প্রতি সতর্কতা শেখার প্রতি আগ্রহ, সৃষ্টির প্রতি প্রেম, মানুষের প্রতি ব্যবহার দিয়ে যদি কোনো ব্যক্তিকে বিচার করা হয়, তাহলে ওয়াদুদ ভূইয়া নিঃসন্দেহে একজন সময় উপযোগী আদর্শ মানুষ। মানুষের প্রতি, পার্বত্য এলাকার সকল জাতিগোষ্ঠীর প্রতি তার যে ভালবাসা মনে অনুক্ষণ অনুরিত তা যদি নিরপেক্ষভাবে বিচার করা হয় তাহলে যে কেউ বলবেন, পার্বত্য এলাকার জন্য তার চেয়ে বেশি দরদ আর কারও নেই।পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ভাষায়, “ওয়াদুদ ভূইয়া চেয়ারম্যান, আমি তার অনেক নিচের কর্মকর্তা; তারপরও কাজের ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে আমাদের একজন সহকর্মী মনে করতেন। স্নেহময়তার সাথে এগিয়ে আসতেন। কোনো উন্নাসিকতা তাঁর মধ্যে দেখিনি। তিনি কখনও রুক্ষতার সাথে আমাদের উপর কোনো কিছু চাপিয়ে দিতেন না বরং না-পারলে বকাঝকাার পরিবর্তে নিজে উদ্যোগী হয়ে সমস্যা সমাধানের জন্য জন্য এগিয়ে আসতেন। নতুনের প্রতি সবার আবেদন চিরন্তন। তবে অনেকে নতুন কিছু গ্রহণে সাহস পান না। একটা ভীতি কাজ করে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ওয়াদুদ ভুইয়া এ ব্যাপারে অত্যন্ত সাহসী ভূমিকার পরিচয় দিতে সক্ষম একজন দূরদর্শী প্রশাসক। তিনি নতুন কিছু গ্রহণে কখনও ভয় পেতেন না এখনও পান না। অপ্রিয় সত্য কথা তিনি অমায়িক বচনে প্রিয়ভাবে বর্ণনা করতে পারতেন। ফলে যার অসন্তুষ্ট হবার কথা সে-ও তেমন অসন্তুষ্ট হতো না। তার নতুনত্বকে, নতুন চিন্তা ও পরিবর্তনশীলতাকে গ্রহণ করলে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নগরে পরিণত করার সক্ষমতা রাখেন।”

কর্মপরিবেশ কর্ম সম্পাদনের অন্যতম নিয়ামক। আনন্দময় পরিবেশ কর্মকে অবসরের মতো অতুলনীয় করে তোলে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন যে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী তার নেতৃত্বে কাজ করেছেন তারা সবাই এটি স্বীকার করেন। তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কর্মপরিবেশকে আনন্দময় করে তুলতে পারেন। মনে হয় এ জন্য তিনি এত নিবিড় ও উদয়াস্থ পরিশ্রমের পরও ক্লান্ত হন না এবং তাঁর সহকর্মীরাও বিরক্ত বোধ করেন না। শুধু তাই নয়, কাজের ব্যাপারে তিনি খুব সচেতন। স্বীকৃতি উদ্দীপনাকে বর্ধিত করে। কারও কাছ হতে শুধু চাপ আর ভয় দেখিয়ে কাজ আদায় করার কৌশল কোনো কালে সফলকাম হয় নি। বিশেষত বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ। ওয়াদুদ ভূইয়া বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখেন। যিনি কাজ করেন, তাকে তিনি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেন। সবার সামনে তিনি তাঁর প্রশংসা করতেন। তবে কারও ভুলটা ধরিয়ে দিতেও কসুর করেন না। অনেক সময় মুখের উপর বলে দেন- তবে খুব ভদ্র ও মার্জিত ভাষায়। তিনি মনে করেন, জীবন ও কর্ম শিকলের মতো। শিকলের প্রতিটি রিঙই অপরিহার্য। কোনো একটি রিঙ দুর্বল হয়ে গেলে পুরো শিকলটাই দুর্বল হয়ে যেতে বাধ্য। তাই তিনি তাঁর কর্মীবাহিনীর প্রত্যেককে নিবিড় পরিচর্যায় দক্ষ করে তোলেন।

ওয়াদুদ ভূইয়া দেশপ্রেমিক। জাতির দুঃসময়ে আপন বলয়ে সামর্থ্যরে পূর্ণ ডালা নিয়ে এগিয়ে যান মানুষের প্রয়োজনে, জাতির কল্যাণে। উজাড় করে দেন নিজের সামর্থ্য। অতীত ও বর্তমান ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে তার দেশ প্রেমের প্রমাণ স্পষ্ট। পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন সময় অনুষ্ঠিত বন্যা, পাহাড়ি ঢল, অগ্নিকা- প্রভৃতিসহ বিভিন্ন সামাজিক দুর্যোগে দুর্গত মানুষের প্রতি উজাড় করে দিয়েছেন বিত্ত, চিত্ত এবং সামর্থ্য। তিনি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। তার পিতা ও ভাই ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। সংগত কারণে তার মনে আছে দেশ প্রেমের অগাধ চেতনা। শিশুবেলায় দেখেছেন স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান তার জন্ম এলাকা রামগড়ে বসে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তির প্রতি অবিচল আস্থা এবং প্রগাঢ় শ্রদ্ধা তাঁর অস্থি মজ্জার অংশ। তাই বলে তিনি একমুখী নয়, বহুমুখী। সবাইকে নিয়ে দেশে গড়ার প্রত্যয় তার চেতনার ধারায় জন্ম থেকে বিকশিত একটি রাষ্ট্রনায়কসুলভ উন্মেষ। এ বিশ্বাসে অবিচল থেকে দেশের কল্যাণে, মানুষের মঙ্গলে উদাত্ত মাধুরিমায় স্বাধীনতার স্বাদকে পরিপূর্ণ আনন্দে উপভোগের ক্ষেত্র প্রস্তুতে তিনি প্রতিনিয়ত ঐকান্তিক। ঐক্য ও গোষ্ঠগিত সম্প্রীতি বিস্তারে তার আজীবন শ্রম, ত্যাগ ও নিষ্ঠা মানবীয় মূল্যবোধের পরম প্রকাশ। তিনি মনে করেন সম্প্রীতি ছাড়া উন্নয়ন, উন্নয়ন ছাড়া সভ্যতা এবং আর্থিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা ছাড়া স্বাধীনতা পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করা যায় ন।

মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তার অনাবিল সম্মান, শ্রদ্ধাময় ভালবাসা ও অবিচ্ছিন্ন সহানুভূতি মুক্তিযুদ্ধের পরও থেমে থাকেনি। মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পর অনেক মুক্তিযোদ্ধা চরম আর্থিক সংকটে নিপতিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছিলেন। ওয়াদুদ ভূইয়ার পরিবার স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের পাশে ছুটে এসেছিলেন। গৃহহীন মুক্তিযোদ্ধাকে দিয়েছিলেন গৃহ, বস্ত্রহীনে বস্ত্র, খাদ্যহীনে খাদ্য। চিকিৎসার জন্য অনেক মুক্তিযোদ্ধা দিনের পর দিন বিছানায় পড়ে কাতরাচ্ছিলেন। অনেকে টাকার অভাবে সোমত্ত মেয়ের বিয়ে 102দিতে পারছিলেন না। ওয়াদুদ ভূইয়া ও তার পরিবার নিজ তহবিল হতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের সকল অভাব পূরণ করেছিলেন। সে সময় ভূইয়া পরিবার খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, ফেণী, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা হতে আগত অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের হারানো মনোবলকে চাঙ্গা করে তুলেছিলেন।
কর্মস্থলে তিনি অমায়িক বাৎসল্যে পরিশুদ্ধ একজন দীক্ষাগুরু, আলোক বর্তিকা। তার কথা, আচরণ, ব্যবহার এবং মননশীলতা এতই চমৎকার যে, তার সংস্পর্শে এলে সবাই সহজে অভিভূত হয়ে যায়। তার অমায়িকতা বদলে দেয় ব্যক্তিকে, গড়ে তুলে নতুন ভাবনার উদ্যোমী প্রেরণা। তিনি বলেন কম, প্রকাশ করেন অধিক। শোনেন বেশি শুনান কম। আইন-কানুন, বিধি-বিধান, রাষ্ট্র ও প্রশাসন সম্পর্কিত খুঁটিনাটি বিষয়ে তার সম্যক জ্ঞান রয়েছে। যা প্রয়োজন হতে পারে তা তিনি পূর্বাহ্নে হৃদয়ঙ্গম করে আলোচনায় আসেন। যুদ্ধ ক্ষেত্রে যাবার আগে প্রয়োজনীয় সকল অস্ত্র নিয়ে তারপর নামেন। জয়-পরাজয় স্বাভাবিক। তাই বলে পরাজয়কে বিনা প্রতিরোধে মেনে নেয়ার পাত্র তিনি নন। পরাজয় তাঁকে আহত করে না, বরং নব-প্রত্যয়ে দীপ্ত করে, উদ্বেলিত করে তুলে নবজয়ের স্বপ্নীল প্রত্যাশায়। তার রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউপর রহমান প্রত্যন্ত রামগড় হতে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটিয়ে মনোবল, উদ্যোম, দেশপ্রেম, নিষ্ঠা আর সাহসিকতার বলে বাংলাদেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। এ উদাহরণ তাকে প্রতিনিয়ত উজ্জ্বীবিত রাখে। তার যে ভুল নেই তা নয়, কেউ ভুলের উর্ধ্বে নন। তবে ভুলকে তিনি অভিজ্ঞতার প্রসূতি মনে করেন। ভুল হতে শিক্ষা নিয়ে ভুলের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন অবলীলায়।

শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ¯েœহ এবং দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার রাজনীতিক প্রেরণার অনাবিল সান্নিধ্য ওয়াদুদ ভূইয়ার অনুপ্রেরণা। জিয়া তাঁর আদর্শ, খালেদা জিয়া রাজনীতিক অনুধ্যান এবং তরুণ প্রজন্মের স্বাপ্নিক রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমান তাঁর আদর্শিক অভিভাবক। জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত ও খালেদা জিয়ার স্নেহধন্য ওয়াদুদ ভূইয়া জাতীয়তাবাদী দলকে নিজের জীবনের চেয়েও পরম মমতায় লালন করেন। সেই শিশুকাল থেকে জিয়া তার অন্তরে আদর্শের, দেশপ্রেমের ও মননশীলতার যে বীজ বুনে গেছেন তা পুরো পৃথিবীর বিনিময়েও পরিবর্তন করা যাবে না। ওয়ান-ইলিভেনের পর বিএনপিকে বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার জন্য তাঁর ভূমিকা ও বুদ্ধিমত্তা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জরুরি সরকারের নীল নক্সায় অংশ নাÑ নেয়ায় তাঁকে অনেক হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। সে সময় তার উপর যে অত্যাচার করা হয়েছে তা মনে করতে শরীর শিউরে উঠে। আলাপ করতে গিয়ে আবেগে চোখ বুজে ফেলতে বাধ্য হন। জরুরি সরকার তার পড়নের লুঙ্গি পর্যন্ত ছিনিয়ে নিয়েছেন। তবু তিনি মাথা নত করেননি। এমন সাহসিকতায় ওয়াদুদ ভূইয়ার পাথেয়, জীবনের সম্বল। এমন কয়জন পারে বলুন!!! তাঁর দৃঢ় উক্তি, জীবন দেবো, তবু দেশনেত্রীর প্রতি আনুগত্য হতে এক চুল নড়বো না। বিএনপির দুঃসময়ে তিনি দলের জন্য আর্থিক ও মানসিকভাবে প্রচুর কাজ করেছেন। নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার নিমিত্ত তার নিরলস শ্রম ও ব্যয় চোখে নাÑ দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। এখনও তিনি চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে পুরো ১৮ ঘণ্টা বিএনপির মঙ্গলে, কল্যাণে নিবেদিত করেন। এটি যারা তাকে নিকট থেকে দেখেছেন তারা কোনভাবে অস্বীকার করতে পারবেন না।

ওয়াদুদ ভূইয়া সম্পর্কে বলতে গিয়ে তার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের চেয়রম্যান থাকাকালীন একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘‘মার্জিত ভাষা ও সুললিত কণ্ঠের অধিকারী জনাব ভূইয়া দর্শনে যেমন মুগ্ধকর উপস্থাপনায় তেমনি অনাবিল, আচরণেও মধুময়। প্রতিটি বাক্য অকাট্য যুক্তির নির্যাস; স্পষ্ট এবং অর্থবহুল। অপ্রয়োজনীয় কথা বলাকে তিনি অহেতুক বুলেট ছোড়ার সামিল মনে করেন। যথাযোগ্য ব্যক্তিকে যথামর্যাদা প্রদান করতে পারেন। তবে এত সহজ সরল যে, সবাইকে বিশ্বাস করে বসেন। অনেক সময় এটি তার ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ওয়াদুদ ভূইয়া সম্পর্কে প্রাক্তন এক সচিবের সঙ্গে আলাপ করি। তিনি জানান, আমার মনে হয়েছে, তিনি এমন একজন রাজনীতিবিদ, যিনি জনগণের কল্যাণে সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত একজন সাধারণ মানুষ। জনগণ এমন একজন সহজ মানের অসাধারণ রাজনীতিবিদকে তাদের নেতা হিসেবে চান। এমন নেতাই দেশের ভাগ্য বদলে দিতে পারে স্বপ্নীল আগামীর ভাবনায়। অনেক রাজনীতিবিদ মনে করেন ক্ষমতায় যেতে হলে সন্ত্রাসীদের সহায়তা প্রয়োজন। ওয়াদুদ ভূইয়া এমন হীন মানসিকতায় মোটেও বিশ্বাস করেন না। তিনি মনে করেন, সন্ত্রাসীরা পক্ষান্তরে দলকে জনবিমুখ করে তোলে। জনগণের কাছে যেতে হলে জনগণের শত্রু সন্ত্রাস আর সন্ত্রাসীকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। আমি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে থাকার সময় তাকে খুব কাজ থেকে দেখেছি। মনে হয়েছে একটা শিশু। এমন নিষ্পাপ খুব কম লোকের মধ্যে আছে। পার্বত্যবাসীর প্রতি তার আজন্ম দরদ ভ্রাতৃত্ববোধকেও হার মানায়। আমি তাকে বয়সে ছেলের সমান হলেও শ্রদ্ধা করি। নিরহঙ্কারী ও পার্বত্য চট্টগ্রামে সহনশীল রাজনীতির প্রবক্তা ওয়াদুদ ভূইয়া স্বল্প সময়ের মধ্যে সবার নজরে নমস্য বিমূর্ততায় অভির্ভূত। তিল তিল পরিশ্রমে তিনি নিজেকে শুন্য থেকে এ অবস্থানে উপনীত করেছেন। তবু তিনি লালসাহীন, নির্লোভ। যার লোভ নেই, তিনি সবার কাছে লোভনীয়, আকর্ষণীয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হতে শুরু করে পিয়ন, গ্রামে ধনী হতে শুরু করে ভিক্ষুক সবার প্রতি সমভাবুলতা তার বিশাল বৈশাল্যেও মহানুভবতার পরিচায়ক।

ওয়াদুদ ভূইয়া আপাদমস্তক পরিচ্ছন্ন। অনুপম শৈলিকলার সহনশীল সমসত্তায় নিগূঢ় তাঁর রাজনীতিক কর্মকা- এবং জনসংযোগ। তবে তিনি কিছুটা লাজুক; নিভৃতচারী ও প্রচার-বিমুখ। কর্মে তিনি এত বিশ্বাসী যে, প্রচার নামক বিষয়টি তার জীবনে তেমন দাগ ফেলতে পারে না। এটি কিন্তু বর্তমান রাজনীতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য আমি মনে করি যৌক্তিক না। বলা হয়, প্রচারই প্রসার। তিনি মনে করেন, ‘প্রচার নয়, কাজই আমার প্রধান লক্ষ। প্রচার দিয়ে কী হবে?’কাঠ নিজে পোড়ে অন্যকে আলো দেয়, 112ফুল-ফল ও সবুজের সম্ভার মাটির অবদান। কিন্তু মাটির খবর কেউ রাখে না। ঠিক তেমনি ওয়াদুদ ভূইয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল অধিবাসীর কল্যাণে যা করেছেন এবং করেন তা অতুলনীয়। অনেক কিছু করেও তিনি নিজেকে সাধারণ ভাবেন। শিক্ষা, উন্নয়ন, সংগঠন, রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, পরিবেশ, প্রশাসন ইত্যাদিসহ আর্থসামাজিক ব্যবস্থার সর্বক্ষেত্রে তাঁর অবদান রয়েছে। তিনি যেখানে যান সেখানে একটি পরম আবহ সৃষ্টি করার সামর্থ্য রাখেন। সৃষ্টি করেন অনুকূল পরিবেশ। অনেকে অন্যকে কথা বলতে দেন না, শুধু নিজেই বলে যান। ওয়াদুদ ভূইয়া কিন্তু অন্য রকম। তিনি সবার কথা শুনেন, সবাইকে গুরুত্ব দেন। পরে যা প্রয়োজন এবং উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ শুনতে চান তাই বলেন। মানুষের মন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় অনুপম। কারও কষ্ট তিনি সহ্য করতে পারেন না। তাই তিনি অসাধারণ হয়েও সাধারণ, সাধারণ হয়েও অসাধারণ। ‘বাতাস ছাড়া মানুষ এক মুহূর্ত বাঁচতে পারে না। কিন্তু বাতাস আছে বলে আমরা তাঁর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে পারি না। বাতাস না থাকলে বোঝা যেত, বাতাস কত অনিবার্য। ঠিক তেমনি ওয়াদুদ ভূইয়া পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য কত অনিবার্য, কত প্রয়োজনীয় এটি সেদিনই অনুধাবন করা যাবে যেদিন তিনি থাকবেন না। শুধু পার্ববত্য চট্টগ্রাম নয়, সারা বাংলাদেশে ওয়াদুদ ভূইয়া একটি পরিচিত মুখ, পরিচিত নাম। পার্বত্য এলাকার শিক্ষা বিস্তারে শিশুবেলা থাকে তার অনবদ্য ভূমিকা সর্বমহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। শিক্ষার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন তাঁর অনুধ্যায়ী চেতনার উত্তম প্রকাশ।

অনেকে রাজনীতি করেন ক্ষমতার জন্য, ভোগের জন্য। ওয়াদুদ ভূইয়া রাজনীতি করেন ত্যাগের জন্য, উন্নয়নের জন্য। রাজনীতিতে আসার পর তিনি রাজনীতি হতে এক পয়সাও লাভবান হননি বরং তাঁর আগমন পার্বত্যবাসীর রাজনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে, পরিশুদ্ধ করেছে। পরের ধনে পোদ্দারি কি রাজনীতি? আমাদের দেশে রাজনীতি মানে পরের ধনে পোদ্দারি, ছোট ছোট জনগণের বিন্দু বিন্দু ক্ষমতা জড়ো করে অধিকাংশ রাজনীতিক জনগণের উপর পোদ্দারি করেন। অহমিকায় অন্ধ হয়ে যান। ক্ষমতার তোড়ে মানুষকে মানুষ মনে করেন না। ওয়াদুদ ভূইয়া এমন একজন রাজনীতিবিদ যিনি জনগণের ক্ষমতা জনগণকে বিলিয়ে দিয়ে পুরো নিঃস্ব হবার প্রত্যয়ে দৃপ্ত। নিপাট অধ্যবসায়, প্রগাঢ় মনোনিবেশপ্রসূত অভিজ্ঞান ও কৃতজ্ঞতার তিলোত্তম মহিমায় বিভূষিত এবং বিরল অন্তর্দৃষ্টি ও যৌক্তিক মিথষ্ক্রিয়ার মাঝে সত্য-মিথ্যা ও বাস্তবতাকে চিহ্নিত করে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার এক প্রবল ক্ষমতা রয়েছে তার। তাই তিনি পরিপূর্ণ রাজনীতিক, আদর্শ নেতা এবং অনুসরণীয় একজন ব্যক্তিত্ব। যার উপর নির্ভর করা যায় সম্পূর্ণ। তিনি রাজনীতিবিদ, তবে গতানুগতিক নন। তিনি যুক্তিতে অমিয়, বস্তুনিষ্ঠতায় অনুপম। পার্বত্য এলাকায় তিনি সহনশীল রাজনীতির প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত। রাজনীতির মাঠেও প্রতিন্দ্বীর গলা জড়িয়ে ধরতে পারেন পরম ভালোবাসায়, নিবিড় শ্রদ্ধায়। উন্নয়নই তার লক্ষ্য, গ্রহণমুগ্ধতা তার দর্শন, জীবনবোধ তার আদর্শ। জনকল্যাণ ছাড়া তিনি রাজনীতিতে আর কিছু আছে বলে মনে করেন না। তার মতে, রাজনীতি শুধু দেয়ার জন্য, নেয়ার জন্য নয়। এমন মননশীল চেতনার অধিকারী বলে, পার্বত্যবাসীগণ তাঁর প্রতি অনুরূপ অনুরক্ত। অধিকাংশ পার্বত্যবাসী ওয়াদুদ ভ্ইূয়া ছাড়া আর কিছু বোঝেন না।

ওয়াদুদ ভূইয়া শুধু রাজনীতিক নন, নেতাও বটে। তথাকথিত নেতা নন, নেতার সকল প্রায়োগিক ও তাত্ত্বিক উপাদানে পরিপূর্ণভাবে বিদুষিত একজন জনমন নন্দিত নেতা। একজন নেতার যে সকল গুণাবলী থাকা প্রয়োজন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে নেতার যে সকল গুণাবলীকে অনিবার্য বলে চিহ্নিত করা হয়েছে তার অধিকাংশই ওয়াদুদ ভূইয়ার রয়েছে। তিনি কৃতজ্ঞতায় আকাশ, তাঁর জন্য যারা এক পা নামেন তিনি তাদের জন্য দশ পা নামতেও দ্বিধা করেন না। যাদের ভালোবাসায় তিনি সিক্ত তাদের জন্য রিক্ত হতে প্রস্তুত। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ তাঁর অনাবিল চরিত্রের নিখাদ অলঙ্কার। তিনি মনে করেন, কৃতজ্ঞতাই প্রকৃত সম্পদ এবং অভিযোগ হচ্ছে দারিদ্র্য। তাই কারও প্রতি অভিযোগ নয়, ভালবাসা। কেউ তার প্রতি বিরক্ত হলে তিনি কৃতজ্ঞতায় সিক্ত হয়ে তাকে ক্ষমা করে দেন।

ধর্ম সম্পর্কে তাঁর ধারণা, অভিব্যক্তি ও বিশ্বাস যেমন উদার তেমনি প্রজ্ঞাময়। তিনি মুসলমান, তিনি বাঙ্গালি, তিনি জাতীয়তাবাদী; সর্বোপরি তিনি পার্বত্যবাসী সবার মনে লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর একজন উদার মনের সহনশীল মানুষ। মুসলমান হলেও তার প্রিয় নবী মুহাম্মদে (সা এর মত পরমতসহিষ্ণু। পার্বত্য এলকায় বসবাসকারী 113প্রত্যেকে মুসলমানকে যেমন ভালবাসেন তেমনি ভালবাসেন হিন্দু, বৌদ্ধসহ অন্য সকল ধর্মাবলম্বীদের। তাঁর শরীরে মোঘল রক্ত। তবে তিনি অসাম্প্রদায়িক। তার পরিষ্কার উক্তি, ‘হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই একই ¯্রষ্টার সৃষ্টি। স্রষ্টা তার সৃষ্টিকে ভালবেসে সৃষ্টি করেছেন। তাই কারও প্রতি অসম্মান, অশ্রদ্ধা পক্ষান্তরে স্রষ্টাকে অপমান করার সামিল। এমন হীন কাজ আমি জীবন গেলেও করতে পারব না। মানবতার চেয়ে বড় ধর্ম আর নেই। আমি মানবতায় বিশ্বাসী। বস্তুত: চিন্তা, চেতনা ও কাজ-কর্ম এবং রাজনীতিতে আমি একজন মানবতাবাদী ও সর্বজনের হিতাকাঙ্কী ব্যক্তি। ছোট বেলা থেকে আমি সেভাবে বেড়ে উঠেছি, সে শিক্ষাই পরিবার থেকে পেয়েছি। ছোট বেলায় আমি বাংলা, আরবি ও উর্দু-ফারসির সাথে চাকমা ভাষাও রপ্ত করেছি। আমার যেমন মুসলমান বন্ধু আছে তেমনি আছে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান। পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত জাতিধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবাই আমার প্রিয় আপন জন। সবাইকে আমি ভালবাসি, শ্রদ্ধা করি। আমি আমার বেড়ে উঠার জন্য তাদের সবার কাছে ঋণী।’ তিনি আরও বলেন, মনুষ্যত্বের পরিচয়েই আমি মানুষকে বিচার করে থাকি। এখানে জাতি-ধর্ম, উপজাতি কিংবা অ-উপজাতি মুখ্য বিষয় নয়। আমার কাছে সবসময় মানুষই বড়। আমার ব্যবহারিক জীবনেও এ আদর্শই আমি সবসময়েই লালন করে আসছি এবং করব। আমি একটি অসাম্প্রদায়িক খাঁটি বাঙালি পরিবারে উপজাতি ও অ-উপজাতি পরিবেষ্টিত পার্বত্য উপত্যাকায় মানুষ হয়েছি। তাই আমার চেতনায় পার্বত্য এলাকার সকল জাতিগোষ্ঠী সমান মর্যদায় অভিষিক্ত পরম শ্রদ্ধার মানুষ। কাউকে আমি কোনদিন কোন অবস্থায় অবহেলা করব না। এমন শিক্ষায় আমার রক্তে বাহিত।

ওয়াদুদ ভূইয়া সাহসী। একজন জননেতার যেরূপ সাহস প্রয়োজন এবং সাহসকে যে কাজে ব্যবহার করা প্রয়োজন তেমনি করার সামর্থ্য রাখেন তিনি। পার্বত্য চট্টগ্রামের গুচ্ছগ্রামের বাঙ্গালীদের রেশন নিয়ে এক সময় ব্যাপক চাঁদাবাজি হত। হেলাল গং চাঁদাবাজির নেতৃত্ব দিত। নীরিহ সধারণ লোকের সরলতাম ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে হেলাল গং প্রায় ২৬ হাজার পরিবার থেকে কার্ড প্রতি ৫ কেজি করে খাদ্য শস্য আদায় করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেন। এক সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ হতো স্পেশাল এ্যাফেয়ারর্স ডিভিশন থেকে। গুচ্ছগ্রামের রেশনও এ বিভাগ থেকে বরাদ্দ কর হতো। হেলাল গং খোজ-খবর রাখতেন কখন রেশন বরাদ্ধ হচ্ছে। ডিও ইস্যুর সাথে সাথে হেলাল গং হুংকার দিতেন,আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে গুচ্ছগ্রামের রেশন বরাদ্দ দেয়া না হলে খাগড়াছড়ি অচল করে দেওয়া হবে। আর রেশন আসার সাথে সাথে গুচ্ছগ্রামবাসীকে বোকা বানিয়ে রেশন এসেছে তার হুমকির কারণে এমন অজুহাত তুলে চাঁদাবাজি করতেন। কী নির্মমতা সাধারণ মানুষকে নিয়ে একজন মানুষ করতে পারে তা ভাবলে মানুষ হিসেবে লজ্জায় মুখ ঢেকে রাখা ছাড়া উপায় থাকে না।

সে সময় হেলাল গঙদের এমন হীন কাজে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি। হেলাল বাহিনীর প্রচ- সন্ত্রাসীদের ভয়ে সবাই তটস্থ থাকত। এমন অবস্থায় হেলালের অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে যে লোকটি সাহসীকণ্ঠে জনকল্যাণের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন তিনি ছিলেন ওয়াদুদ ভূইয়া। তরুন নেতা ওয়াদুদ ভূইয়ার প্রতিরোধের মুখে গুচ্ছগ্রামবাসী রক্ষা পান চাঁদাবাজ হেলাল গং থেকে। পার্বত্যবাসী ওয়াদুদ ভূইয়ার সাহস, দেশপ্রেম আর নিঃস্বার্থ তাগের উজ্জীবন শিখায় আপ্লুত হয় উঠেন। এতদিন তাদের মনে নেতৃত্বহীনতার যে সংকট ছিল তার দূরীভূত হতে চলেছে। জনগণগ প্রবল আবেগে তরুণ নেতা ওয়াদুদ ভূইয়ার প্রত্যয় দীপ্ত সাহসে নিবেদিত কল্যাণময় কর্মকা-ের সহযোদ্ধা হিসেবে এগিয়ে আসেন। পার্বত্যবাসী খুঁজে পান তাদের নেতা। যার প্রাণে সাহসের অণল, হৃদয়ে ভালবাসার দহন।

ভূইয়া পরিবারের ঐতিহ্য অনেক প্রাচীন। সে ঐতিহ্যে লালিত ওয়াদুদ ভূইয়া জন্ম থেকে প্রতিবাদী। প্রতিবাদি যে কোন অন্যায়, অবিচার আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে। উপরে বর্ণিত হেলাল গঙের ঘটনা ছাড়া এরূপ আরও অনেক ঘটনার কথা বলা যায়। তিনি রাজনীতিক জীবনের সূচনালগ্ন থেকে অনিয়ম ও দূর্নীতির বিরুদ্ধে ইস্পাত কঠিন প্রতিবাদের অজয় হিমালয়। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত খাগড়াছড়ি স্থানীয় সরকার পরিষদ নির্বাচনে তিনি সর্বোচ্চ লক্ষাধিক ভোট পেয়ে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে চেয়ারম্যান সমীরণ দেওয়ানের অনিয়ম-দূর্নীতির প্রতিবাদ স্বরূপ পদত্যাগ করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। যেখানে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা চুরির দায়ে অভিযুক্ত হলেও ক্ষমতা আঁকড়ে ধরেন সেখানে ওয়াদুদ ভূইয়ার মত একজন তরুন নেতার এমন সাহসী ও নির্লোভ ত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনুসরণীয় ও বিরল ঘটনা বৈকি।

পার্বত্য অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তার ওয়াদুদ ভূইয়ার অবদান চিরস্মরণীয়। যখন সুযোগ পেয়েছেন শিক্ষা বিস্তারে উদার হস্তে এগিয়ে এসেছেন। শিশুবেলায় অসহায় ও দরিদ্র সতীর্থদের লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে তার মনোভাবের পরিচয় পাঠক ইতোমধ্যে পেয়েছেন। ওয়াদুদ ভূইয়া ছাত্র জীবন থেকে সৃষ্টি ও সেবামূলক কাজে সম্পৃক্ত। আশির দশকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রামগড় সফরে আসেন। এ সময় কিশোর ওয়াদুদ ভূইয়া তার বিশাল সতীর্থ বাহিনী নিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। প্রেসিডেন্ট তাদের দাবি কী জানতে চাইলে ওয়াদুদ ভূইয়া সবিস্তার যুক্তিসহ রামগড়ে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার আবেদন করেন। ওয়াদুদ ভূইয়ার অকাট্য যুক্তি আর হৃদয়গ্রাহী বক্তব্যে বিমুগ্ধ প্রেসিডেন্ট রামগড় কলেজ স্থাপনের ঘোষনা দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করার জন্য জেলাপ্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ ঘটনা এখনও সবার মুখে মুখে ফে।ে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯২ সালে ১৩ মে খাগড়াছড়ি সফরে আসেন। এ সময় ওয়াদুদ ভূইয়ার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নিকট থেকে রামগড় কলেজকে জাতীয়করণের ঘোষণাও আদায় করে নেন। শুধু রামগড় কলেজ নয়, ওয়াদুদ ভূইয়ার হাতে গত তিন দশকে শত শত কলেজ,মসজিদ,মাদ্রাসা,মন্দির,কেয়াং গড়ে উঠেছে। যা এখন পুরো খাগড়াছড়ি জেলায় কালের স্বাক্ষী হিসেবে দাড়িয়ে আছে। এবং আমুল বদলে দিয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থার মান। মূলত তার হাতে পার্বত্য চ্টগ্রামের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সতিক্যার প্রসারের মহান অনুভবের আলেখ্য প্রতিষ্ঠা পায়। শিক্ষক সমাজকেও তিনি সবসময়েই শ্রদ্ধার চোখে দেখে থাকেন। উপমন্ত্রী পদমর্যাদায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে অধিষ্ঠিত থাকাকালীন তিনি তাঁর শিক্ষক দেখলে গভীর আবেগ পরম শ্রদ্ধা জানাতে বিন্দুমাত্র সংকোচ বোধ করেন না।

ওয়াদুদ ভূইয়া সহানুভূতির বরপুত্র, ভালবাসার নিয়ামক। মানুষের দুঃখে সকল বিপদ তুচ্ছ করে এগিয়ে যাবর যে মানসিকতা পার্বত্য অঞ্চলে তা আর কোন নেতার মধ্যে আছে কিনা আমার জানা নেই। খাগড়াছড়ি জেলার সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতি রক্ষায় ওয়াদুদ ভূইয়ার অবদান এ অঞ্চলের মানুষ চিরদিন স্বরণে রাখবে। আশির দশক থেকে শান্তিবাহিনী হাজার হাজার লোককে খুন করেছে, গুম করেছে; আহত করেছে। আগুন দিয়েছে লোকালয়ে। যেখানে মানুষের বিপদের সংবাদ পেয়েছে সেখানে নিজের জীবন ভয়কে তুচ্ছ করে দৌঁড়ে গিয়েছেন। তিনি নিজে লাশ টেনেছেন,দাফন করেছেন,সাধ্যমত আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছেন। আবার সাধারণ পাহাড়িরা যাতে হামলার শিকার না হন তার জন্য তার কর্মী বাহিনী দিয়ে রাত-দিন পাহারা দিয়েছেন। যারা তার কর্মীবাহিনীকে হত্যা করেছে, অত্যাচার করেছে তাদের উপর এমন সহানুভূতি মহামানবের প্রতিবিম্ব ছাড়া কারও পক্ষে করা সম্ভব নয়।

সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার মানসিকতা অধিকাংশ রাজনীতিবিদের স্বাভাবিক চরিত্র। ওয়াদুদ ভূইয়া কখনও সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন না। বরং সিদ্ধান্তই তাকে বাস্তবতার বিমূর্ত বিকেলের মতো নন্দিত করে তোলে। তাই তাঁর সিন্ধান্তগুলো সব সময় যথার্থ ও নান্দনিক হয়ে ওঠে। যুক্তি, গ্রহণ মানসিকতা, ঔদার্যময় প্রেরণা ও যথামূল্যায়নের কার্যকর দক্ষতা তাঁকে সংকট মোকাবেলায় মহানা ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। ওয়াদুদ ভ্ইূয়ার আচরণ কিংবা ব্যবহারে প্রতিপক্ষ কখনও আহত হন না। তিনি কাউকে কষ্ট দিয়ে কোনো কথা বলেন না। তবে যা সত্য তা বলতেও দ্বিধা করেন না। সংসদে, মাঠে, রাজনীতিক মঞ্চে, অফিসে, সবখানে তিনি অমায়িক, মার্জিত। কেউ তাঁর প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেও তিনি অকারণে ক্ষুব্ধ হন না। অনেক সময় অনেকে তাঁর প্রতি রাগ দেখালেও তিনি থাকেন সাবলীল, সহাস্য। এরূপ হাসি দিয়ে তিনি কত রাগান্বিত লোকের হৃত স্বাভাবিকতা জাগ্রত করে কলহাস্যে মেতে উঠেছেন তার ইয়ত্তা নেই। কৃতজ্ঞতা তাঁর চরিত্রের আর একটি বিশেষ গুণ। কেউ তাঁর সামান্য উপকার করলে তিনি তা কথা, কাজ আর নিষ্ঠা দিয়ে অসংখ্যভাবে ফেরত দেয়ার চেষ্টা করেন। অর্পিত দায়িত্ব পালনে তিনি এত সচেতন এবং এত নিষ্ঠাবান যে, কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানোর সকল পথ অবারিত হয়ে যায়। তিনি যা বলেন মেপে, যা করেন ভেবে। প্রত্যেকটি কাজ নিবিড় পর্যক্ষেণ ও বুদ্ধিমত্তার সাথে সম্পন্ন করেন। তিনি বিনয়ী, ভদ্র ও মার্জিত। স্বাভাবিক দৃষ্টিতে মনে হয় কোমল; প্রকৃতপক্ষে আপোষহীন চেতনায় অনড় একটি ভীষণ হিমালয়; যদি সত্য প্রতিষ্ঠায় ব্যত্যয় ঘটে। তাঁর জীবনের অনেক ঘটনা এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

বন্ধু হিসেবে ওয়াদু ভূইয়ার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অবলোকন করলে সেই বিখ্যাত উক্তিটি মনে পড়ে যায়- ফ্রেন্ড ইজ বরন, নট মেইড। প্রকৃতি মানুষকে সেরা জীবন উপভোগের জন্য যে সকল সম্পদ ও ঐশ্বর্য্য দিয়েছেন তন্মধ্যে বন্ধুই সর্বশ্রেষ্ঠ। ওয়াদুদ ভূইয়ার সাথে বন্ধুত্ব হলে প্রথম এটিই মনে পড়ে। তার বন্ধুত্বে 2581কোন খাদ নেই, নিখাদ। তিনি মনে করেন বন্ধু হবার একমাত্র উপায় অভিন্ন হয়ে যাওয়া। তিনি এটি পারেন। তাই ভার্জিনিয়া উলফ এর ভাষায় নির্ধিদ্বায় বলে দিতে পারেন: Some people go to priests, others to poetry; I to my friend. সাধারণত কেউ বিপদে পড়লে শুভাকাক্সক্ষীরা এগিয়ে এসে প্রয়োজনের কথা জানতে চান; জানতে চান কী প্রয়োজন, কতটুক প্রয়োজন। কেউ বিপদে পড়লে ওয়াদুদ ভূইয়াকে এমন প্রশ্ন করতে দেখিনি। তিনি নিজে গিয়ে যা প্রয়োজন তা করে দিয়ে যান স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যমের আকণ্ঠ মুগ্ধতায়। বন্ধু বিপদে পড়কে কী প্রয়োজন, কতটুক প্রয়োজন এবং কখন প্রয়োজন এটি যে অনুধাবন করতে পারে না সে আবার কীসের বন্ধু!

ওয়াদুদ ভূইয়া একজন কুশলী মানুষ। সুন্দর মন বিরজিত অপলক দৃষ্টি তার ব্যক্তি চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কিশোর বয়স থেকে ক্ষমতায়, ঐশ্বর্য্যে বড় হয়েছেন। এ বয়সে অর্থ, ক্ষমতা ও এমন ঐশ্বর্য্য অনেকের মধ্যে অনেক বদ অভ্যাসের অবতারণা ঘটায়। কিন্তু ওয়াদুদ ভূইয়া এমনভাবে গড়ে উঠেছেন যে, কোন অবস্থাতে কোন বদঅভ্যাস, সামাজিক উচ্ছৃঙ্খলতা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তার চারিত্রিক দৃঢ়তা এতই প্রবল যে, কোন প্রলোভন তাকে ঢলাতে পারেনি একবিন্দু। শুধু কর্মে নয়, আচরণেও তার চারিত্রিক দৃঢ়তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এমনভাবে তিনি বলেন, যাতে কেউ কষ্ট না-পায়, এমনভাবে দেখেন যাতে কারও মনে লজ্জা, দুঃখ বা ভীতির 2582সঞ্চার না হয়। কারও সমালোচনা করার সময়ও শালীনতাবোধ বজায় রাখেন। তিনি তর্কে যৌক্তিক, চেতনায় উদার। কথার মাঝে তাখে দার্শনিক নন্দনযুক্ত শালীন রসবোধ, আগ্রহের প্রতিবিম্ব। আরও শুনার ইচ্ছা শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখে। একবার কোন কিছু শুনলে সহজে ভুলেন ন। এ গুণটা অনেক বড় বড় নেতার মত ওয়াদুদ ভূইয়াতেও পূর্ণমাত্রায় দেখা যায়। তার কথায় প্রেরিত আহবান যৌক্তিক আর মনোরম। যা কথাকে উপভোগ্য এবং হৃদয়গ্রাহী করে তোলে। রাগ মানুষের আজন্ম স্বভাব। তবে তার রাগ সাধারণ মানুষের মত নয়। রাগ সম্পর্কে তাঁর একটা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আছে। সেটি হল- Anybody can become angry, that is easy; but to be angry with the right person, and to the right degree, and at the right time, and for the right purpose, and in the right way, that is not within everybody’s power that is not easy. তিনি বলেন, এতগুলো বিষয়কে সমন্বয় করে রাগ করা পৃথিবীর খুব কম মানুষের পক্ষে সম্ভব। তাঁর চাইতে নিজের রাগকে গোপন রেখে মানুষের প্রতি উদার মনোভাবে এগিয়ে যাওয়া সবচেয়ে উত্তম। তার প্রতি অনেকে দুর্ব্যবহার করেছে, মিথ্যা মামলায় হয়রানি করেছে। তিনি যে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন, ইচ্ছা করলে তাদের বিরুদ্ধে চরম প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু নেননি, ক্ষমা করে দিয়েছেন। চরম শত্রুকেও ক্ষমা করে দেয়ার মত অসাধারণ ক্ষমতা তার রয়েছে।

ওয়াদুদ ভূইয়ার মত বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী অনবদ্য এক নেতার অবয়ব রচনা দূরে থাক, কর্মচাঞ্চল্যের একটি মুহূর্তের প্রকাশও এ স্বল্প পরিসরে আমার পক্ষে সম্ভব নয়। একদিন একটা কথার জবাব দিতে গিয়ে বলেছিলেন, আমি নিজে একজন মানুষ, অতি ক্ষুদ্র; যেমন আমার চার পাশে যারা আছে তাদের একজনের মত। তবে আমার মধ্যে যদি আলাদা কিছু থাকে তা হচ্ছে আমার নির্বাচনী এলাকার জনগণের সম্মিলিত রূপ- তাদের আশা-আকাঙ্খা। দূর হতে দেখতে দেখতে কোন্ সময় কখন কীভাবে একাত্ম হয়ে গিয়েছি জানি না। এটি অনেকে গভীর আবেগে হারিয়ে যাবার মত অবস্থা। বুঝতে পারলাম : অমন সুদৃশ্য বিশালতায় হারিয়ে যাবার কষ্ট কত আনন্দের। ওয়াদুদ ভূইয়ার প্রত্যয়ী পরিভাষার কোমল লাস্যে প্রেমের সাথে মধুময় জীবনের প্রত্যাশা বৃষ্টির মতো2583 শ্যামল করেছে খাগড়াছড়িসহ পার্বত্যবাসীর জনগণমনের চেতনা ও রাজনীতির জটিল ক্ষেত্র। রাজনীতিক সন্ত্রাস, সংকীর্ণ স্বার্থ, হানাহানি, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে ওয়াদুদ ভূইয়ার অবস্থান বাংলাদেশের রাজনীতিকে পরিশীলিত করার একটি মহৎ উদ্যোগ। তিনি তাঁর সংসদীয় এলাকার রাজনীতিকে কলুষমুক্ত ও জনকল্যাণমূখী করার চেষ্টায় সতত নিবেদিত। এলাকায় তিনি দল-মত নির্বিশেষে অভিন্ন হৃদ্যে একাকার। তিনি ব্যবহারে বিনয়ী, কর্মে নিষ্ঠ, সিদ্ধান্তে বলিষ্ঠ, আচরণে শিষ্ট, বিচক্ষণতায় ঋদ্ধ, ব্যবস্থাপনায় মার্জিত এবং কৃতজ্ঞতায় অনুপম। পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষের আগমন ঘটে যারা প্রকৃতির মত নির্ঝর। যারা প্রত্যয়ের আলোর সাথে হাসে, ন্যায়-নিষ্ঠা প্রতিষ্ঠায় দুপুরের কড়া রোদের মত তপ্ত, সেবায় রূপোলি বিকেলের মত আকর্ষণীয়, স্নেহে জ্যোস্নার মত মায়াময়। যারা বৃষ্টির সাথে কাঁদে, নদীর সাথে গায় আবার ক্ষণে ক্ষণে জীবনের চৈতালী সাজায় নিজেকে উজাড় করে দিয়ে অন্যের জন্য। ওয়াদুদ ভূইয়া এমন অনাবিল চরিত্রের অধিকারী একজন বিরল মানুষ।

ভিনস্ লেম্বর্ডির একটা উক্তি আছে। তিনি বলেছেন, The man on top of the mountain didn`t fall there.. পাহাড়ের চূড়োয় কেউ উপর থেকে হঠাৎ এসে পড়ে না। পাহাড়ের চূড়োয় উঠতে হয়। এর জন্য প্রয়োজন শ্রম, মেধা আর চেষ্টা। ওয়াদুদ ভূইয়া কঠোর শ্রম, নিষ্ঠা, অধ্যবসায় আর আত্মত্যাগের বদৌলতে তিল তিল সাধনায় আজকের স্থানে পৌঁছেছেন। এ আরোহণে তিনি কারও সাহায্যের অপেক্ষায় থাকেন নি। নিষ্ঠা, শ্রম, মেধা আর একাগ্রতার মাধ্যমে জয় করেছেন সর্বোচ্চ শৃঙ্ক। খাগড়ছড়ি তথা পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের সাথে তাঁর 2584সম্পর্ক নিবিড়। খাগড়াছড়ির জনগণ তাঁকে কত ভালোবাসে, তিনিও খাগড়াছড়ির জনগণনে ভালবাসেন। নির্বাচনী এলাকার জনগণের প্রতি ওয়াদুদ ভূইয়ার আলাদা দরদ রয়েছে। যেমন থাকে পরিবারের প্রতি। খাগড়াছড়ি তার নির্বাচনী এলাকা। তিনি নির্বাচনী এলাকার জনগণকে নিজের পরিবারের সদস্যের মতো মূল্যায়ন করে থাকেন। তিনি তাদের সুখ-দুঃখ ও হাসি-বেদনার সার্বক্ষণিক সাথী। জনগণের প্রতি ওয়াদুদ ভূইয়ার সহমর্মিতা যেমন হৃদয়গ্রাহী তেমিন আবেগময় ভালবাসায় অভিষিক্ত।

খাগড়াছড়ি ওয়াদুদ ভূইয়াকে বেশি দিয়েছে নাকি নাকি ওয়াদুদ ভূইয়া খাগড়াছড়িকে বেশি দিয়েছে? এসব নিয়ে তার ভাবার অবকাশ নেই। তিনি ভাবেন না। তিনি শুধু জানেন মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। সুন্দরের মহিমা, প্রাকৃতিক সম্পদের ভাণ্ডার পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ লক্ষ সমস্যায় জর্জরিত, অর্ন্তদ্বন্দ্বে রক্তাক্ত। একে বাঁচাতে হবে, বাঁচাতে হবে যে কোন মূল্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *